এবিএম কাইয়ুম রাজ: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা প্রকৃতি, নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ঘিরে গড়ে ওঠা এই জেলার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এখন ধীরে ধীরে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী ও গাবুরা এলাকার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করছে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। প্রকৃতির এক অনন্য লীলাভূমি সাতক্ষীরা। একদিকে সুন্দরবনের ঘন সবুজ বন, অন্যদিকে নদীঘেরা জনপদ, জেলে ও মৌয়ালদের জীবন, কাঁকড়া ও মাছ ধরার দৃশ্য, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ- সব মিলিয়ে এটি পর্যটনের জন্য একটি আদর্শ এলাকা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ সুন্দরবন দেখতে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় আসছেন। স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শীত মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, ফটোগ্রাফার, গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে সুন্দরবন ভ্রমণ এখন অন্যতম আকর্ষণ। মুন্সিগঞ্জ ঘাট থেকে ট্রলার ও নৌযানে করে পর্যটকরা সুন্দরবনের বিভিন্ন স্পট যেমন করমজল, কটকা, কচিখালী, হাড়বাড়িয়া ও দুবলার চর এলাকায় ভ্রমণ করেন। স্থানীয় সাংবাদিক ফয়সাল আহমেদ জানান, সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটলে পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। পর্যটন খাতকে ঘিরে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্রলার সার্ভিস, ট্যুর গাইড, পরিবহন, হস্তশিল্প ও স্থানীয় খাদ্যপণ্যের ব্যবসা গড়ে উঠতে পারে। এতে বহু বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার ট্রলার মালিক রেজাউন জানান, আগে মৌসুমভিত্তিক আয় হতো মাছ ধরা বা নদীকেন্দ্রিক কাজের মাধ্যমে। কিন্তু এখন পর্যটক বাড়ায় অনেকেই ট্রলার ভাড়া দিয়ে আয় করছেন। এতে স্থানীয় মানুষের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বানর, কুমির, ডলফিন ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। এছাড়া নদীর মাঝখানে সূর্যাস্তের দৃশ্য, বনভূমির নীরবতা এবং প্রকৃতির বিশালতা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে সাতক্ষীরা আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। কারণ সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা চালু করা গেলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এত সম্ভাবনার মাঝেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। উপকূলীয় অনেক এলাকায় এখনো উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্যাপ্ত আবাসিক হোটেল, নিরাপদ পর্যটন ব্যবস্থা, আধুনিক জেটি ও জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাব রয়েছে। অনেক পর্যটক অভিযোগ করেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তারা ভোগান্তিতে পড়েন। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই অঞ্চলের পর্যটন খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইলা, আম্পান ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ ভ্রমণ সুবিধা ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণা বাড়ানো হলে সাতক্ষীরা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন জেলায় পরিণত হতে পারে। তাদের মতে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাতক্ষীরা শুধু একটি উপকূলীয় জেলা নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত।
