এবিএম কাইয়ুম রাজ: নিজস্ব প্রতিবেদক: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা একসময় সুন্দরবন, নদী ও চিংড়ি শিল্পের জন্য বেশি পরিচিত থাকলেও বর্তমানে গাছপাকা সুস্বাদু আমের জন্যও দেশব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে। গ্রীষ্ম মৌসুম এলেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা বিশেষ করে শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, তালা, আশাশুনি ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা যায় আমের সমারোহ। ছোট-বড় অসংখ্য বাগানে ঝুলতে থাকে নানা জাতের আম, আর সেই আমকে ঘিরেই শুরু হয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ব্যস্ততা। সাতক্ষীরার আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণের কারণে এখানকার আমে পাওয়া যায় আলাদা স্বাদ ও ঘ্রাণ। বিশেষ করে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি জাতের আম স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেক চাষি এখন রাসায়নিক ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে আম উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে নিরাপদ ও গাছপাকা আমের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানে চলছে আম সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেটজাত করার কাজ। মৌসুমি এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে অস্থায়ী কর্মসংস্থানও। অনেক শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষ মৌসুমজুড়ে আম বাগানে কাজ করে অতিরিক্ত আয় করছেন। এছাড়া পরিবহন, প্যাকেজিং ও অনলাইন ডেলিভারি খাতেও বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া এলাকার আম বাগান মালিক হাবিবুর মোড়ল বলেন, “আমরা চেষ্টা করি সম্পূর্ণ গাছপাকা ও নিরাপদ আম ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দিতে। সাতক্ষীরার আমের স্বাদ একবার যারা খায়, তারা প্রতিবছর আবারও অর্ডার করে।” কালিগঞ্জ উপজেলার আমচাষি হাফিজুর রহমান জানান, “এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় আমের ফলনও ভালো হয়েছে। তবে ঝড়-বৃষ্টি না হলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগেও সাতক্ষীরার আম দেশের বড় বাজারে তেমন পরিচিত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা, অনলাইন অর্ডার ও কুরিয়ার সার্ভিস সহজ হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সরাসরি সাতক্ষীরার আমের চাহিদা বাড়ছে। প্রতিদিন ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনায় যাচ্ছে শত শত কেজি গাছপাকা আম। তবে আমচাষিদের দুশ্চিন্তাও কম নয়। বৈরী আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও তীব্র তাপদাহের কারণে অনেক সময় বাগানে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথাও জানিয়েছেন তারা। কৃষকদের দাবি, সরকারি সহায়তা ও সহজ ঋণ সুবিধা বাড়ানো হলে আমচাষ আরও সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সাতক্ষীরায় প্রতিবছর আম চাষের পরিধি বাড়ছে। কৃষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ ফল উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সাতক্ষীরার আমকে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ চলছে সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের বিপণন নিশ্চিত করা গেলে খুব শিগগিরই সাতক্ষীরার গাছপাকা আম দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশের বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
