স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও বন্যার দুর্ভোগ কাটিয়ে নতুন আশার আলো দেখছে সাতক্ষীরার বেতনা নদী তীরবর্তী এলাকা। একসময় বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে থাকা ফসলি জমিতে এখন দিগন্তজুড়ে দুলছে সবুজ ইরি-বোরো ধান। এতে কৃষকদের মুখে ফিরেছে স্বস্তির হাসি, বুকভরা আশা নিয়ে তারা অপেক্ষা করছেন ঘরে ধান তোলার। সদর উপজেলার ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর ও ফিংড়ী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা গত ৬ থেকে ৭ বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছিল। ফলে আমন চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের উদ্যোগে বদলে গেছে সেই চিত্র। এক ফসলি জমিতেই এবার বাম্পার ইরি-বোরো আবাদ হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ইরি-বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর। তবে তা ছাড়িয়ে ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪১ হাজার ৪৪২ মেট্রিক টন চাল। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলাতেই ২৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অর্জিত হয়েছে ২৩ হাজার ৩১০ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন চাল। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো চাষাবাদ এবং নিয়মিত পরিচর্যার কারণে এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি কর্মকর্তারা। এ বছর ব্রি-ধান ২৮, ব্রি-৮৮, ব্রি-৮১, ব্রি-১০১, ব্রি-১০২, ৫০ শুভলতা, এসএল-৮এইচ শক্তি-২, শক্তি-৩, ইস্পাহানী-৯ ও আলোড়ন রেড মিনিকেটসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল ও লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকার ফলে জমির আগাছা পচে জৈব সারে পরিণত হয়েছে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। এতে ধানের ফলন আরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মাছখোলা গ্রামের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, “এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গতবারের তুলনায় ফলন ভালো হবে।” দামারপোতা গ্রামের কৃষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, “এভাবে আবহাওয়া ভালো থাকলে বাম্পার ফলন নিশ্চিত।” ধুলিহর এলাকার কৃষক ইলিয়াস হোসেন বাবু জানান, “ঘেরের জমিতে মাছ চাষের পর ধান আবাদ করে এবার দ্বিগুণ লাভের আশা করছি।” সাবেক ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, “ধান ভালো হয়েছে, তবে ঘরে না তোলা পর্যন্ত শঙ্কা থেকেই যায়।” তবে আশার মাঝেও রয়েছে কিছু শঙ্কা। বিশেষ করে ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। স্থানীয় কৃষক আইয়ুব আলী বলেন, “ডিজেল না পেলে সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, এতে ফসল ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।” উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, “পরিমিত সার প্রয়োগ, নিয়মিত পরিচর্যা ও সময়মতো পরামর্শ দেওয়ার ফলে রোগবালাই কম হয়েছে। আমরা আশা করছি, এবার বাম্পার ফলন হবে।” সবকিছু অনুকূলে থাকলে বেতনা নদী তীরবর্তী এই অঞ্চলে চলতি মৌসুমে ইরি-বোরো ধানের রেকর্ড ফলন হতে পারে, যা বদলে দিতে পারে হাজারো কৃষকের জীবন-জীবিকা।
