এবিএম কাইয়ুম রাজ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদে বসবাসকারী হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন-এর সঙ্গে। জীবনের ঝুঁকি জেনেও প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে এই বনে ছুটে চলেন তারা। মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ, মধু আহরণ ও গোলপাতা কাটা—এসবই তাদের প্রধান আয়ের উৎস। শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও কৈখালী ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। ভোরের আলো ফুটতেই ছোট নৌকায় তারা নদী পাড়ি দিয়ে বনের গভীরে প্রবেশ করেন। কখনো তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত বনের মধ্যে অবস্থান করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের জেলে মোঃ মফিদুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবনে না গেলে সংসার চলে না। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই বনে যেতে হয়। কখনো মাছ পাই, কখনো খালি হাতে ফিরি, তবুও পরিবারের জন্য আবার যাই।” গাবুরার জেলে মোছাঃ আছমা খাতুন বলেন, “আমাদের জন্য সুন্দরবনই সব। এখন আগের মতো মাছ-কাঁকড়া পাওয়া যায় না, তবুও দিন পার করতে চলে এখানে।” স্থানীয়রা জানান, বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়সীমায় এবং সীমিত সংখ্যক জেলে বনের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেন। তবুও ঝুঁকি কমে না। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, চিকিৎসা সেবার অনুপস্থিতি, বাঘের আক্রমণ, কুমির, দস্যু, আকস্মিক ঝড়—সবই জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর কেউ না কেউ বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান, ফলে নারীরা ‘বাঘ-বিধবা’ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও স্পষ্ট। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে। নদী ভাঙনের ফলে অনেক পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছেন। তবুও তারা আশা ছাড়েন না। প্রতিদিন ভোরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে নৌকা ভাসান সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটানোর সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।
