খুলনা ব্যুরো: যে বাড়িতে নতুন বউকে ঘিরে আনন্দ আর উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, সেখানে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। স্বজনদের কাঁধে চড়ে শেষযাত্রায় বিদায় নিলেন বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪ জন। শুক্রবার (১৩ মার্চ) পৃথক পৃথক স্থানে জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। এর আগে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সকালে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের বাড়ির পাশের মাঠে নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু, তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদী রাশিদা বেগম (৭৫) ও নানী আনোয়ারা বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কয়রায় পারিবারিক কবরস্থানে মিতু, লামিয়া ও রাশিদার দাফন করা হয়। দাকোপে আনোয়ারা বেগমের আরেকটি জানাজা শেষে সেখানে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মাইক্রোবাস চালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। শুক্রবার জুমার আগে গ্রামের বাড়িতে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে জুমার পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাক তার পুত্র বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং তাদের তিন সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম। শুক্রবার ভোরে তাদের কফিন মোংলার শেহালাবুনিয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারীতে এলাকার পরিবেশ ভারী হযে ওঠে। শুক্রবার জুমার আগে মোংলায় একই পরিবারের ৯ জন নিহত হওয়ার মোংলা উপজেলা মাঠে নামাজে জানাজায় অংশ নেয় বাগেরহাট-৩ আসনের (মোংলা-রামপাল) সংসদ সদস্য ও পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাত, বাগেরহাট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর এডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ, বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী, সহকারী পুলিশ সুপার রিফাতুল ইসলাম, পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. জুলফিকার আলী, সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান, সাধারণ সম্পাদক আবু হোসেন পনিসহ নিহতদের স্বজন এবং কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন মোংলা ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. রুহুল আমিন। পরে মোংলা কবরস্থানে পাশাপাশি নয়জনকে দাফন করা হয়। কানায় কানায় ভরে যায় উপজেলা পরিষদ মাঠ। জানাজার আগে আবেগঘন কণ্ঠে নিহতদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন স্ত্রী, সন্তান, বাবা, ভাই ও বোন হারানো আশরাফুল আলম জনি। তার আকুতিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জনি বলেন, “আমি বাবা, ভাই, স্ত্রী, সন্তান, বোন, ভাগ্নেÑসবই হারিয়েছি।
আমার বাবা রাজনীতি করতেন, ভাইরা ব্যবসা করতেন। কারও যদি কোনো দেনা-পাওনা থাকে জানাবেন, আমরা পরিশোধ করব। আর সবাইকে তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করছি।”
জানাজার আগে বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী নিহত পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। আব্দুর রাজ্জাক একজন সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। তিনিসহ নিহত সকলের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।”
বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বলেন, “যে বাড়িতে আজ আনন্দের পল্গুধারা থাকার কথা ছিল, সেখানে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। আমরা শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।”
এদিকে শত শত মানুষ ভিড় করছেন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে কখনো দেখিনি। এই দৃশ্য সহ্য করা খুবই কঠিন।
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার বলেন, আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। রাজ্জাক ভাই মেয়ের বিয়েও কয়রায় দিয়েছিলেন, এবার ছেলের বিয়েও সেখানে হলো। কিন্তু পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল। তিনি জানান, আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। নিহতদের গোসল শেষে একে একে খাটিয়ায় রাখা হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে তাদের মোংলা পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।
মোংলা কবরস্থানের খাদেম মুজিবুর ফকির জানান, পরিবারের সম্মতিতে একই স্থানে ৯টি কবর খোঁড়া হয়েছে। তিনি বলেন, ১৭ বছর ধরে কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু একসঙ্গে একই পরিবারের এত সদস্যের জন্য কখনো কবর খুঁড়তে হয়নি। ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক।
মাইক্রোবাসের চালক নাঈমও এই দুর্ঘটনায় নিহত হন। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। শুক্রবার জুমার আগে নিজ গ্রামের বাড়িতে তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রীজের দক্ষিণ পাশে এখনো ছড়িয়ে আছে শিশুদের পানির ফিডারের অংশ, কয়েক জোড়া জুতা এবং অসংখ্য কাচের টুকরো। এগুলোই যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে ভয়াবহ সেই সড়ক দুর্ঘটনার, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ঘটনাস্থলে এখনো ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক মানুষ। অনেকেই সেখানে ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরো, জুতা ও বিভিন্ন সামগ্রী দেখে মর্মাহত হচ্ছেন। প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল ইসলাম বলেন, জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখিনি। আমি তখন মাঠ থেকে গরু নিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম গরুটা হয়তো বাসের সামনে পড়ে গেছে। পরে দেখি দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ। চারদিকে রক্ত আর আহত মানুষ-এত মানুষকে একসঙ্গে এভাবে কখনো দেখিনি। শুধু রফিকুল ইসলামই নন, এলাকার অনেক মানুষ ঘটনাস্থলে এসে নিহতদের প্রতি প্রকাশ করছেন শোক সমবেদনা।
অপরদিকে বাগেরহাট-৩ আসনের (মোংলা-রামপাল) সংসদ সদস্য ও পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা-খুলনা সড়কে যে সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে এটি দুঃখজনক। এব্যাপারে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া সড়কে দুর্ঘটনা এড়াতে এখন থেকে কঠোর ভাবে কাজ করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রত্যেককে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের সকল কাগজ পত্র জমা দিয়ে এ টাকা গ্রহন করার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া সরকারী ভাবে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এবং নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
