রবিউল ইসলাম: পবিত্র রমজান এলেই সাতক্ষীরার গ্রামবাংলায় নেমে আসে এক পবিত্র ও আনন্দঘন উৎসবের আবহ। দিনভর সিয়াম সাধনার পর ইফতারকে ঘিরে জেলার সাতটি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন বইছে আনন্দের স্রোত। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সাম্যের বার্তা নিয়ে সাজানো হচ্ছে ইফতারের টেবিল, যেখানে স্থান পাচ্ছে স্থানীয় ঐতিহ্যের নানা মুখরোচক খাবার। গ্রামীণ জনপদের ইফতারের অন্যতম আকর্ষণ হলো ঘরে তৈরি দেশীয় খাবার। মুড়ি, ছোলা ভুনা, পেঁয়াজু, বেগুনি ও আলুর চপের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন গুড়ের শরবত, পিঠা-পুলি এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন। সাতক্ষীরার বিখ্যাত খাঁটি দুধের ছানা ও দই ইফতারের আয়োজনে যোগ করছে বাড়তি স্বাদ ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া। অন্যদিকে, জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় ইফতার সামগ্রীর জমজমাট বেচাকেনা। তালা, কলারোয়া ও আশাশুনি উপজেলার স্থানীয় বাজারগুলোতে বড় বড় কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে গরম জিলাপি, পেঁয়াজু ও চপ। এসব খাবারের সুগন্ধে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বাজার এলাকা। গ্রামের ইফতারের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য হলো পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে ইফতারি বিনিময়ের ঐতিহ্য। আসরের নামাজের পর থেকেই এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ইফতার পাঠানোর ব্যস্ততা শুরু হয়। এই আদান-প্রদান শুধু খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। মসজিদগুলোতেও দেখা যায় ভিন্নধর্মী দৃশ্য। সাধারণ মুসল্লিদের পাশাপাশি পথচারী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করেন এলাকার বিত্তবানরা। বড় বড় পাটি বা চাদর বিছিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে একসঙ্গে ইফতার করার দৃশ্য গ্রামীণ সমাজের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, শহরের যান্ত্রিক জীবনের তুলনায় গ্রামের ইফতারিতে রয়েছে ভিন্ন এক প্রশান্তি ও আন্তরিকতা। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে উঠান বা বারান্দায় বসে ইফতার করা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেও মানুষ সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন এই আনন্দ ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে। সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার গ্রামীণ জনপদে ইফতার এখন শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উৎসবে।
