ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমি। তাতে দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতি বছরই নগরায়ণ, বসতি, অবকাঠামো ও নদীভাঙনে কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছে ৬৯ হাজার হেক্টর কৃষিজমি। দেশে কৃষিজমির এ সংকোচন কৃষির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ কৃষিজমি হারানোর প্রভাব শুধু ফসল উৎপাদনের জমি কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং জমি খণ্ডিত হলে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, সেচ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে নানা বাঁধা সৃষ্টি হয়। আর নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় জমি হারানোর সাথে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে কৃষকের আয় ও জীবিকা। তাছাড়া দেশের চরাঞ্চলে নদীভাঙন, উপকূলে লবণাক্ততা, বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস এবং হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার মতো ভৌগোলিক ঝুঁকিও কৃষির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি অর্থনীতিবিদদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনসংখ্যা। আর ওই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের কৃষিজমি সুরক্ষিত রাখা না যাচ্ছে না। তাতে ভবিষ্যতে খাদ্যোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। তখন দেশে বাড়তে পারে খাদ্য আমদানিনির্ভরতা। বর্তমানে দেশে জনসংখ্যা ও নগরায়ণ বাড়ার সঙ্গে আবাসন, সড়ক, শিল্প ও অন্যান্য অবকাঠামোর চাহিদাও বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে জলবায়ুগত সংকটও। যা কৃষিজমি ও উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। প্রতি বছর গড়ে দশমিক ২৪ শতাংশ হারে কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছে কৃষিজমি। অথচ দেশে খাদ্যোৎপাদন বাড়াতে কৃষিজমিই হচ্ছে মৌলিক ভিত্তি। সূত্র জানায়, দেশে প্রতি বছর কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছে গড়ে ৬৯ হাজার হেক্টর জমি। ১৯৭৬ সালে দেশে ৯৮ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ছিল। কিন্তু ২০২১ সালে তা কমে ৮৩ দশমিক ৩ লাখ হেক্টরে দাঁড়ায়। তখন কৃষিজমি কমার বার্ষিক হার দশমিক ২৪ শতাংশ ছিলো। কিন্তু ভূমি ব্যবহার জরিপ ২০১৯-২০ অনুযায়ী দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। তবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দেশে কৃষিজমি কমার বার্ষিক হার দশমিক ৩৬ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চলতি মূল্যে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিলো ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর কর্মসংস্থানের ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। তাতে স্পষ্ট কৃষিজমির সংকোচন শুধু খাদ্যোৎপাদন নয়, বিপুল জনগোষ্ঠীর আয় ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও জড়িত। গত ২০২৫ সালে দেশে চাল উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ টনে পৌঁছেছে। ১৯৮০ সালে তা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টন। মূলত প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাত, সেচ, সার ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণ ধান উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আবেদীন জানান, দেশে জনসংখ্যার চাপ বাড়ায় প্রতিনিয়ত কৃষিজমির রূপান্তর ঘটছে। কিন্তু তা বন্ধ করা জরুরি। আইনের মাধ্যমে সরকারের পক্ষে কৃষিজমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ, পুকুর খনন, ইটভাটা স্থাপন কিংবা জমির শ্রেণী পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বড় প্রকল্পগুলো সরকারি সংস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও কৃষিজমিতে গড়ে ওঠা ছোট ছোট অবকাঠামো সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সেজন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং কৃষিজমি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতে হবে। জমি কমে গেলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের জোগানও কমবে। কৃষিজমি না থাকলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।
দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে
দেশে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে




