॥ আব্দুর রাজ্জাক রানা ॥
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জনপদ সাতক্ষীরা কেবল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সূতিকাগারই নয়, বরং সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক উর্বর ভূমি। এই অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, না পাওয়ার বেদনা এবং উন্নয়নের প্রত্যাশাকে মূলস্রোতে তুলে ধরার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অনন্য। এই প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আলোর পরশ’ পত্রিকাটি দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই জনপদের মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এর অবদান এবং সামগ্রিক সাতক্ষীরার সাংবাদিকতার গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক গভীর পর্যালোচনা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
দৈনিক আলোর পরশ: পথচলার গল্প ও জনপদের দর্পণ
যেকোনো স্থানীয় পত্রিকার পথচলা কন্টকাকীর্ণ। রাজধানী কেন্দ্রিক গণমাধ্যমের ভিড়ে মফস্বল থেকে একটি দৈনিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা এবং তা টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত সাহসিকতার কাজ। ‘দৈনিক আলোর পরশ’ সেই চ্যালেঞ্জিং কাজটিই অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করে চলেছে।
পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান সমস্যা—লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উপকূলীয় বাঁধ ভাঙন, এবং কৃষি ও মৎস্য খাতের সম্ভাবনা ও সংকটের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছে এই পত্রিকা। শুধু সমস্যা তুলে ধরাই নয়, এর পাশাপাশি সম্ভাবনার দুয়ারগুলোকেও পাঠকের সামনে উন্মোচন করেছে। স্থানীয় তরুণ সমাজ, নারী অধিকার, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে ‘দৈনিক আলোর পরশ’ নিয়মিত বিশেষ পাতা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে, যা সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে।
সাতক্ষীরার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ও বিস্তার
সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতার ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ঢাকা বা কলকাতার মতো মূলধারার সংবাদপত্র প্রকাশের বহু আগেই এ অঞ্চলে সাংবাদিকতার বীজ রোপিত হয়েছিল। মফস্বল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সাতক্ষীরা সবসময়ই এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে।
কালের পরিক্রমায় সাতক্ষীরা থেকে প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি অনলাইন পোর্টাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে জেলায় একাধিক দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। সাতক্ষীরার সাংবাদিকরা কেবল স্থানীয় সংবাদের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুন্দরবন, সাতক্ষীরার আম, চিংড়ি শিল্প এবং সীমান্তবর্তী অপরাধ ও চোরাচালানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সফলভাবে তুলে ধরেছেন।
সাংবাদিকতার সামনে বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
সময়ের সাথে সাথে সাতক্ষীরার সাংবাদিকতা নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি দিক নিচে আলোচনা করা হলো।
বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতার সংকট: তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের যুগে এখন 'ব্রেকিং নিউজ'-এর হিড়িক পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধিপত্যের কারণে অনেক সময় যাচাই না করেই সংবাদ প্রচারের প্রবণতা দেখা দেয়, যা হলুদ সাংবাদিকতার পথ প্রশস্ত করে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: মফস্বল সাংবাদিকদের একটি বড় অংশের পেশাগত ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত নয়। অনেক সময় নামমাত্র সম্মানী বা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে গিয়ে তারা নানা ধরনের চাপের মুখে পড়েন, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায়।
ভয়ভীতি ও নিরাপত্তা: উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় সাতক্ষীরায় বিভিন্ন প্রভাবশালী চক্র, লোনা পানির চিংড়ি ঘেরের মালিক সিন্ডিকেট এবং অপরাধচক্র সক্রিয় থাকে। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকি, মামলা এমনকি শারীরিক হামলার শিকার হতে হয়।
উত্তরোত্তর উৎকর্ষ সাধনের উপায়
সাতক্ষীরার সাংবাদিকতাকে আরও গতিশীল এবং জনকল্যাণমুখী করতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পেশাগত প্রশিক্ষণ: স্থানীয় সাংবাদিকদের মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত রিপোর্টিং, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
মালিকপক্ষ ও সম্পাদকমণ্ডলীর ভূমিকা: ‘দৈনিক আলোর পরশ’-এর মতো প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোকে সংবাদকর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারেন।
ডিজিটাল রূপান্তর: প্রিন্ট সংস্করণের পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সোশ্যাল মিডিয়াকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে সংবাদকে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।
দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতা: সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে হলুদ সাংবাদিকতা পরিহার করে হলুদ আলোর পরিবর্তে প্রকৃত 'আলোর পরশ' হয়ে ওঠার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে।
একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ‘দৈনিক আলোর পরশ’ আগামী দিনেও আলোর দিশারী হয়ে পথ দেখাবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভলগ্নে আমরা পত্রিকাটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি এবং সেই সাথে সাতক্ষীরার সকল সংবাদকর্মীর সাহসী ও পেশাদার ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বস্তুনিষ্ঠতা ও সাহসিকতার হাত ধরে সাতক্ষীরার সাংবাদিকতা আরও উঁচুতে উঠুক, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচার ও সত্যের জয়গান।#
লেখক:
সাধারণ সম্পাদক
মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন খুলনা




