আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার পরিচিতি শুধু সুন্দরবন, চিংড়ি কিংবা ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নে সীমাবদ্ধ নয়; জেলার ঘোষ সম্প্রদায়ের তৈরি ঘোলও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় তিন শ বছর ধরে চলে আসছে সাতক্ষীরার ঘোল বিক্রির ঐতিহ্য—এমনটাই স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। সময়ের পরিবর্তনে খাবারের অভ্যাস বদলালেও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড়বাজারে বংশপরম্পরায় ঘোল, টক দই ও ঘি বিক্রি করে আসছেন তিন ঘোষ পরিবারের সদস্য। তাঁদের কাছে ঘোল শুধু একটি পানীয় নয়, পূর্বপুরুষের পেশা ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার মাধ্যম।
বাজারে কেনাকাটা করতে এসে এক গ্লাস ঘোল পান করা অনেক ক্রেতার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কেউ আসেন রসুলপুর থেকে, কেউবা শ্যামনগরের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক বিভাজন ভুলে একই দোকানে দাঁড়িয়ে ঘোল পান করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এই ক্রেতা-ব্যবসায়ীর সম্পর্ক বড়বাজারের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
রসুলপুর থেকে ঘোল খেতে সুলতানপুর বড়বাজারে এসেছেন আমিরন বিবি। তিনি বলেন, “যখনই বাজার করতে এখানে আসি, তখনই আগে এক গ্লাস ঘোল খেয়ে নিই। ঘোল না খেলে মন ভরে না।” শুধু শহর বা আশপাশের এলাকার মানুষ নন, ঘোলের টানে দূরদূরান্ত থেকেও ক্রেতারা আসেন। শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের দাতিনাখালী এলাকার মাসুম বিল্লাহও ঘোল পান করতে বড়বাজারে ছুটে এসেছেন।
আনছার নামে এক ক্রেতা সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন বিভিন্ন পণ্য কিনতে বড়বাজারে আসেন। বাজারে এলেই ঘোল পান করেন তিনি। মাঝেমধ্যে বাড়ির জন্য টক দই ও ঘিও কিনে নিয়ে যান। তাঁর ভাষ্য, এখানকার খাবারের মান ভালো বলে আশপাশের অনেক ক্রেতাই এসব পণ্যের প্রশংসা করেন।
সুলতানপুর বড়বাজারে বর্তমানে প্রতি গ্লাস টক ঘোল বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। মিষ্টি ঘোলের দাম প্রতি গ্লাস ১৫ টাকা। পাশাপাশি পাওয়া যায় টক দই ও ঘি। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টক দই প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং ঘি প্রতি কেজি ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ঘোলের দাম প্রতি কেজি ৫০ টাকা বলেও জানিয়েছেন এক ব্যবসায়ী।
ঘোলের স্বাদ ও সহজলভ্য দাম ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে গরমের দিনে ঠান্ডা ঘোল অনেকের কাছে প্রশান্তিদায়ক পানীয় হিসেবে জনপ্রিয়। দুধ থেকে তৈরি এই পানীয়তে পুষ্টি উপাদান থাকে; তবে এর পুষ্টিমান নির্ভর করে তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহৃত দুধ এবং অন্যান্য উপকরণের ওপর।
সুলতানপুর বড়বাজারে ঘোল, টক দই ও ঘির ব্যবসা করছেন পুরাতন সাতক্ষীরার ঘোষপাড়ার নিতাই চন্দ্র ঘোষ, দীপংকর ঘোষ ও সঞ্জয় ঘোষ। তাঁদের পরিবারের দাবি, বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা এই পেশার সঙ্গে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। নিতাই চন্দ্র ঘোষ প্রায় ৫৮ বছর ধরে এ ব্যবসা করছেন বলে জানা গেছে। অন্য দুই ব্যবসায়ীও কয়েক দশক ধরে এ পেশায় রয়েছেন।
নিতাই চন্দ্র ঘোষ পুরাতন সাতক্ষীরার ঘোষপাড়ার প্রয়াত সতুশ চন্দ্র ঘোষের ছেলে। সঞ্জয় ঘোষের বাবা প্রয়াত চিত্তরঞ্জন ঘোষ। অন্যদিকে দীপংকর ঘোষের বাবা কার্তিক ঘোষও এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবার পেশা ধরে রেখেছেন দীপংকর।
তিন ব্যবসায়ী পৃথকভাবে পণ্য বিক্রি করলেও একই বাজারে পাশাপাশি তাঁদের ব্যবসা। তাঁরা জানান, প্রতিদিন ঘোল, টক দই ও ঘি তৈরি করে বাজারে নিয়ে আসেন। তাঁদের দাবি, এসব পণ্য খাঁটি দুধ থেকে তৈরি করা হয় এবং পণ্যে ভেজাল মেশানো হয় না।
সঞ্জয় ঘোষ বলেন, “আমি এখানে প্রায় ৫০ বছর ধরে ঘোল, টক দই ও ঘি বিক্রি করি। প্রতিদিন ঘোল, দই ও ঘি নিয়ে বসি। এসব বিক্রি করেই সংসার চলে। কখনো বেচাকেনা ভালো হয়, আবার কখনো কম হয়। তবে নিয়মিত ক্রেতা থাকায় ব্যবসাটা ধরে রাখতে পেরেছি।”
তিনি জানান, সাধারণ দিনে তাঁর দোকানে গড়ে চার-পাঁচ হাজার টাকার বেচাকেনা হয়। কখনো কখনো বিক্রি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায়ও পৌঁছে যায়। তবে ঘোল, টক দই ও ঘি—কোন পণ্যের কতটা বিক্রি হয়, তার ওপর দৈনিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্ভর করে।
দীপংকর ঘোষ বলেন, “আমার বাবা কার্তিক ঘোষ এই ব্যবসা করতেন। এখন আমি সেই ব্যবসা ধরে রেখেছি। আমরা বাড়িতে পণ্য তৈরি করে বাজারে নিয়ে আসি। আমাদের চেষ্টা থাকে ক্রেতাদের ভালো মানের পণ্য দেওয়া।”
নিতাই চন্দ্র ঘোষ বলেন, “একবার যাঁরা আমাদের দোকান থেকে কেনাকাটা করেন, তাঁদের অনেকেই আবার ফিরে আসেন। এভাবে আমাদের নিয়মিত ক্রেতা তৈরি হয়েছে। ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
দুধ বা দই থেকে তৈরি ঘোল সুপরিচিত একটি পানীয়। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় শরীরকে সতেজ রাখতে এবং পানির চাহিদা পূরণে এটি সহায়ক হতে পারে। ঘোলে দুধের কিছু পুষ্টি উপাদান থাকে, যার মধ্যে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন বি১২ উল্লেখযোগ্য—যদিও পরিমাণ নির্ভর করে প্রস্তুতপ্রণালি ও ঘনত্বের ওপর।
সাতক্ষীরা সুলতানপুর বড়বাজারের ঘোল, টক দই ও ঘির মান নিয়ে জানতে চাইলে জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা দীপংকর দত্ত বলেন, “সুলতানপুর বাজারে টক দই, ঘোল ও ঘি বিক্রি হয় বলে শুনেছি। পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার জন্য সেখান থেকে নমুনা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর এসব পণ্যে ভেজাল আছে কি না, সে বিষয়ে জানা যাবে। এ ছাড়া এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করেননি।” তিনি আরও জানান, জেলার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে টক দই ও ঘি বিক্রি হলেও সুলতানপুর বড়বাজারের ওই ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ঘোল বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে তিনি জানেন।
স্থানীয় এই খাদ্যঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণ এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করা। ঐতিহ্যের সঙ্গে গুণগত মানের সমন্বয় ঘটাতে পারলে সাতক্ষীরার ঘোল ভবিষ্যতেও জেলার পরিচিত খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে থাকতে পারে।
আবু সাইদ বিশ্বাস
সাতক্ষীরা
২৪/১০/২৬




