এফএনএস বিদেশ : অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে বন্দুকযুদ্ধে দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যার কথা জানিয়েছে দখলদার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গতকাল শুক্রবার অবৈধ তেলেম বসতির কাছে রিজার্ভ সেনাদের একটি ব্যাটালিয়নে হামলার পর এ ঘটনা ঘটে। দেশটির অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের বরাতে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বলছে, এই বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ছয় ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি নম্বরপ্লেটযুক্ত একটি গাড়িতে করে এসে হেবরনের আশপাশের একটি সামরিক চৌকির কাছে সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রায় ২০ মিনিট ধরে গোলাগুলি চলে। পরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দুই ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করে এবং শহরজুড়ে অবরোধ জারি করে। সাম্প্রতিক অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের সহিংসতা বেড়েছে। বিশেষ করে চলতি জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের ওপর এসব হামলার ঘটনা ঘটছে। এদিকে আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলের নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এ ঘটনার পর গতকাল শুক্রবারের নির্বাচনী কর্মসূচি বাতিল করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির অধিকৃত পশ্চিম তীরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘অনেক দেরি হওয়ার আগেই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভেঙে দিতে হবে, নিরস্ত্র করতে হবে এবং তাদের সন্ত্রাসী অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে।’
ইউরোপে গরমে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে এবারের গ্রীষ্ম হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের ৮৫৪টি শহরে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ২০০৩ ও ২০২২ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের সময়ের তুলনায়ও এ সংখ্যা ৭০ শতাংশের বেশি। নেচার হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা। এতে ইউরোপের ৩০টি দেশের শহরাঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ১৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। গবেষণায় আয়ারল্যান্ডের শহরাঞ্চলেও তাপপ্রবাহের প্রভাব উঠে এসেছে। সেখানে গ্রীষ্মের তিন মাসে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে আনুমানিক ৬০ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এর মধ্যে প্রায় ৩৫টি মৃত্যুর জন্য দায়ী মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। গবেষকরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। তবে আয়ারল্যান্ডের হিসাবটি শুধু শহরাঞ্চলের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে, পুরো দেশের নয়। গবেষকদের হিসাবে, শুধু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এ বছর ইউরোপের ৮৫৪টি শহরে অতিরিক্ত ৩২ হাজার ৬১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা ২০০৩ ও ২০২২ সালের ভয়াবহ গ্রীষ্মে তাপজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু গবেষক ডক্টর ক্লেয়ার বার্নস বলেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু এবং স্বজন হারানোর বেদনা। গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম ইউরোপে এ গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দিনে কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে ১২ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছিল। গত ১৭ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত তীব্র তাপপ্রবাহে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে গ্রীষ্মের মোট তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে। ওই সময় গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। দেশভিত্তিক হিসাবে, ইতালিতে তাপজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৩০৩। এরপর ফ্রান্সে ৭ হাজার ২৬৮, স্পেনে ৬ হাজার ৮২৪ এবং জার্মানিতে ৬ হাজার ৩৪০ জনের মৃত্যু হয়। যুক্তরাজ্যে তাপপ্রবাহে আনুমানিক ৪ হাজার ৩৫৪ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫টি মৃত্যুর জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী। গবেষণার ফলাফল বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপপ্রবাহকে তীব্র করছে না, বরং ইউরোপে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ। ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন বয়স্ক ব্যক্তিরা। তবে কম বয়সীরাও এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন। গবেষকদের হিসাবে, এবারের গ্রীষ্মে তাপজনিত কারণে ৬৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে মারা গেছেন আনুমানিক ২২ হাজার ৫০২ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের শুরুর দিকে তাপজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তা বেড়ে ৬৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডক্টর পিয়ের ম্যাসেলো বলেন, চরম তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু ইউরোপের উষ্ণ অঞ্চলগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন এলাকাও এখন তীব্র গরম ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ইউরোপের শহরগুলোকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য শহরকে শীতল রাখার ব্যবস্থা, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। গবেষকরা জানান, এই বিশ্লেষণে শুধু শহরাঞ্চলের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ইউরোপজুড়ে তাপজনিত মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। গবেষক ডক্টর ক্লেয়ার বার্নস সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরো বৃদ্ধি ঠেকাতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দ্রুত কমাতে হবে। পাশাপাশি বয়স্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।