মাসুদ রানা
‎শীতের আগমনের সাথে সাথেই আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনে উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে খেজুরের রস ও ঝোলা গুড়-পাটালি। আর “যশোরের যশ, খেজুরের রস”Ñএই বিখ্যাত প্রবাদের টানে সারাদেশের মানুষের নজর থাকে খেজুরের গুড়ের প্রাণকেন্দ্র যশোর জেলার দিকে। তবে সময়ের সাথে সাথে এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় যশোরের সেই চিরচেনা রূপ ও ঐতিহ্য এখন তীব্র সংকটের মুখে। পর্যাপ্ত গাছি (রস সংগ্রহকারী) সংকট, বেপরোয়াভাবে গাছ কেটে ফেলা এবং নতুন গাছ না রোপণের ফলে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে খেজুরের রস ও গুড়ের উৎপাদন। রস ও গুড়ের প্রতি নতুন প্রজন্মের তীব্র আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দুষ্প্রাপ্যতা ও ভেজালের ভিড়ে সেই গ্রামীণ উদ্দীপনা আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। ‎‎সংকট ও চ্যালেঞ্জ: ‎কেন কমছে ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস? যশোর অঞ্চলে খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ পরিলক্ষিত হয়: ‎১. গাছির তীব্র সংকট: ‎গাছে হাঁড়ি বাঁধা, গাছ চাঁছা এবং রস সংগ্রহ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বয়স্ক গাছিরা কাজ ছেড়ে দিলেও নতুন প্রজন্ম পেশাগত অনিশ্চয়তা ও কঠোর পরিশ্রমের কারণে এই পেশায় আসতে আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে রস সংগ্রহের উপযোগী হাজারও গাছ অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ‎২. খেজুর গাছ নিধন ও বিকল্প রোপণের অভাব: ‎ইটের ভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রতিনিয়ত শত শত খেজুর গাছ নিধন করা হয়েছে। তাছাড়া জমি বিক্রি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে কাঁচা রাস্তার ধারের খেজুর গাছ কেটে ফেলা হলেও নতুন করে খেজুরের চারা রোপণের তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ‎৩. প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে রস কমে যাওয়া: ‎শীতের স্থায়ীত্ব আগের চেয়ে কমে যাওয়া এবং আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে গাছে রসের পরিমাণও বিগত বছরগুলোর তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে। ‎৪. খাঁটি গুড়ের জায়গায় নকল ও ভেজালের আধিপত্য: ‎রস ও গুড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চিনি, কেমিক্যাল ও ফ্লেভার মিশিয়ে কৃত্রিম গুড় তৈরি করছে। এতে খাঁটি গুড়ের বাজার মার খাচ্ছে এবং সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। ‎ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ: ‎যশোরের ইতিহাস ও কৃষ্টির সাথে জড়িয়ে থাকা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি: ‎১.গাছিদের সরকারি প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ: ‎গাছিদের পেশাগত নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তা দিতে বিশেষ ঋণের সুযোগ করা প্রয়োজন। আধুনিক ও নিরাপদ উপায়ে গাছ চাঁছার কৌশল শিখাতে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করতে পারেন। ‎১.ব্যাপক চারা রোপণ অভিযান: ‎সড়কের দুই পাশে, নদীর বাঁধে এবং পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে খেজুরের চারা রোপণের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ‎৩.খেজুর গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা: ‎ইটভাটা বা বাণিজ্যিকভাবে খেজুর গাছ পোড়ানো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং সামাজিক বনায়নে খেজুর গাছকে প্রাধান্য দিতে হবে। ‎৪.জিআই (এও) পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন ও খাঁটি গুড় বাজারজাতকরণ: ‎যশোরের খেজুরের গুড় একটি ভৌগোলিক নির্দেশক (এও) পণ্য। সরাসরি গাছিদের কাছ থেকে মানসম্মত রস ও গুড় সংগ্রহ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সারাদেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিলে গাছিরা সঠিক দাম পাবেন এবং এই পেশায় উৎসাহিত হবেন। ‎পরিশেষে বলতে পারি-খেজুরের রস শুধু খাদ্যসামগ্রী নয়, এটি আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানার এক অনন্য প্রতীক। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে খেজুরের রস ও গুড় কেবল বইয়ের পাতায় কিংবা রূপকথার গল্পেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। যশোরের ঐতিহাসিক সুনাম এবং ঐতিহ্য রক্ষা করতে আমাদের এখনই একযোগে কাজ করতে হবে।