আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরার কৃষিজমি এখন শুধু ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে এটি ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পোকামাকড় দমনের নামে কৃষিজমিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের উচ্চঝুঁকির বালাইনাশক। এর রাসায়নিক উপাদান মিশছে মাটি ও পানিতে। সেই সঙ্গে কৃষিপণ্যে থেকে যাচ্ছে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি উৎপাদনে নানা সংকট থাকায় অনেক কৃষক রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক বালাইনাশকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ফলে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি। সূত্রমতে, বাংলাদেশে বালাইনাশকের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। ১৯৫৬ সালে দেশে মাত্র ৩ মেট্রিক টন বালাইনাশক আমদানি করা হয়েছিল। অথচ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ ৪০ হাজার টন ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ কয়েক দশকের ব্যবধানে বালাইনাশকের আমদানি বেড়েছে বহুগুণ। কৃষিতে রাসায়নিক নির্ভরতার এই বিস্তার এখন শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩২৭টি মলিকিউল বা ভ্যারিয়েন্টের বালাইনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পণ্য হাজার হাজার ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। সূত্রের হিসাবে নিবন্ধিত ব্র্যান্ডের সংখ্যা ৭ হাজার ৪০৫টি। ১৯৬০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বালাইনাশকের বাজারে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ক্ষতিকর পণ্য দ্রুত নিষিদ্ধ বা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যবসায়িক স্বার্থে চাপ তৈরি হয়। ফলে সিদ্ধান্ত হলেও তার বাস্তবায়ন অনেক সময় ধীরগতির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ল্যাবে ২০১৬ সাল থেকে ফল, সবজি, পান, শুঁটকি মাছসহ বিভিন্ন পণ্যে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় ১০ শতাংশ সবজি ও ৪ শতাংশ ফলে বিপজ্জনক মাত্রায় বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। পান ও শুঁটকি মাছেও এমন অবশিষ্টাংশ শনাক্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দেশে ব্যবহৃত ৩২৭টি কেমিক্যাল পেস্টিসাইড মলিকিউলের মধ্যে ৭০টির বেশি পরীক্ষা করার সক্ষমতা ওই ল্যাবের নেই। দেশে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর হার ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে বলে বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়। ক্যানসার, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পিটাকের সভাপতি ড. মো. আবদুছ ছালাম জানিয়েছেন, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় এলাকায় এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।