আবু সাঈদ বিশ্বাস: দোকান বরাদ্দ, দৈনিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুরের মেলায় বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী একটি মহল মেলাটি পরিচালনা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ মেলা এবার বড় বাণিজ্যিক মেলায় রূপ নিয়েছে। মেলা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠলেও সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক নেতারা।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২৩ দিনে দোকান ও অন্যান্য খাত থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি ইজারাদারদের নিজস্ব দুটি যান্ত্রিক নৌকায় জনপ্রতি ৫০ টাকা টিকিটে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। প্রতি নৌকায় ঘণ্টায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয়ের অভিযোগ রয়েছে। সে হিসাবে দুটি নৌকা থেকে দৈনিক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০ অক্টোবর মঙ্গলবার মেলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অঘোষিতভাবে আরও তিন দিন সময় বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসক কাউছার আজিজ জানান, মেলার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ানো হয়নি। স্থাপনা খুলে সরিয়ে নিতে আয়োজকেরা সময় চেয়েছেন। তাই ধীরে ধীরে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

সাতক্ষীরা পৌরসভার মালিকানাধীন শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে মেলাটি অনুষ্ঠিত হলেও পৌরসভা এখন পর্যন্ত কোনো রাজস্ব পায়নি বলে জানা গেছে। ফলে প্রতিদিনের অর্থ আদায় এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেলায় দোকানের শ্রেণিভেদে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিন এক হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিল বাবদ দৈনিক ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইটের জন্য ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। দোকান স্থাপনের জন্য ১০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দেওয়ার কথাও বলেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

মেলায় স্টল নেওয়া জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাহিদা আক্তার জানান, তাঁবুর জন্য ৭ হাজার টাকা, ডেকোরেশনের জন্য ৯ হাজার টাকা এবং ইটের জন্য ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং তিনটি লাইটের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। শৌচাগার ব্যবহারে প্রতিবার ১০ টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন দোকানদার। তাঁদের দাবি, তাঁবুর জন্য দোকানপ্রতি ২০ হাজার টাকা এবং ডেকোরেশনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া দোকানপ্রতি ৩০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন আরও ৪ হাজার টাকা করে হাসানকে দিতে হচ্ছে বলেও কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন।

ব্যবসায়ীদের এসব বক্তব্যে মেলায় দোকান পরিচালনার উচ্চ ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের ভিত্তিতে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের ছেলে হাসান শিকদার ও মাহবুব শিকদারের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।

সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব আলীনুর খান বাবুল অভিযোগ করেন, মেলার নামে গভীর রাতে জুয়ার বোর্ড বসানো হচ্ছে এবং মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁর আরও অভিযোগ, উঠতি বয়সী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মেলায় আসা নারী ও শিশুদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মেলা থেকে প্রতিদিন আদায় হওয়া বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে?

মেলার ইজারা ও হাসান শিকদারের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, তাঁরা নড়াইলের আওয়ামী লীগ নেতা মানিক শিকদারের ছেলেকে গুড়পুকুরের মেলার ইজারা দেননি। খুলনার একজনকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন স্টল স্থাপনের জন্য যাঁরা এসেছেন, তাঁরা ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে মানিক শিকদারের ছেলে কীভাবে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য বা নথিপত্র নেই।

মেলার ইজারার মোট দর কত ছিল, জানতে চাইলে আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, গুড়পুকুরের মেলা দীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে ইজারার মোট দর কত ছিল, তা তিনি বলতে পারেননি।

অন্যদিকে, মেলার পরিচালনা ও এ পর্যন্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান শিকদার বলেন, “ওটা আমি জানি না ভাই, খরচখরচা বাদ দিয়ে যা থাকবে, তাই।” মেলার সময়সীমা, ব্যয় এবং প্রশাসনকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণত মেলা এক মাস থাকে। তবে এবার দেশের পরিস্থিতির কারণে ২০ দিন করা হয়েছে। খরচের বিষয়টি সবাই মিলে ঝুঁকি নিয়ে সামলাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে হাসান শিকদার বলেন, তাঁর দলের কোনো পদ নেই। তিনি ব্যবসায়ী এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

এদিকে, সাতক্ষীরা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জানান, শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্ক পৌরসভার মালিকানাধীন জায়গা। এ জায়গা বৃক্ষমেলা, স্থানীয় মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজনের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে গুড়পুকুরের মেলাও সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এ মেলা থেকে পৌরসভা এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের রাজস্ব আদায় করেনি বা পায়নি বলে তিনি জানান।

একটি সূত্রের দাবি, প্রায় সাড়ে চারশ দোকানমালিক দৈনিক দেড় থেকে দুই কোটি টাকার বেচাকেনা করেছেন। সে হিসাবে ২৩ দিনে ব্যবসায়ীদের মোট বিক্রির পরিমাণ ৩৪ থেকে ৪০ কোটি টাকা হতে পারে। আকাশভালো থাকায় অন্য বছরের তুলনায় এবার ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা ভালো হয়েছে বলেও সূত্রটি জানায়। মেলায় কয়েক লাখ দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এ ছাড়া প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানা গেছে।

বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই এবারের মেলা শেষ হয়েছে