৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩, আহত সাড়ে ৬ হাজার: এইচআরএসএস
ডেস্ক রিপোর্ট: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ২ হাজার ৬৩২ জন আহত এবং ৪০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ২ হাজার ১৯০ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ৯৩টি ঘটনায় ৫৪৫ জন আহত এবং ৯ জন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষের ৪৭টি ঘটনায় ৩২০ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে পাঁচটি ঘটনায় ৫৮ জন এবং আওয়ামী লীগ-জামায়াতের মধ্যে দুটি ঘটনায় তিনজন আহত ও একজন নিহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের একটি ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৩২০ জন আহত হন। অন্যান্য ছোট-বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৭৪টি ঘটনায় ৪০৫ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৪৬ জন, জামায়াতের আটজন, আওয়ামী লীগের ছয়জন এবং চরমপন্থী সংগঠনের একজন রয়েছেন। এ ছাড়া একজন সাধারণ নারীসহ অন্যান্য দলের বা রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া ১২ জন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়িঘর ও যানবাহন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং চাঁদাবাজির মতো ঘটনা রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার অন্তত ৮৮টি ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১০০ জন আহত এবং বিভিন্ন দলের ৫২ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ২ হাজার ৬২৩ জন আহত এবং ১৩ জন নিহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের নামে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের ৫ হাজার ৬৪৪ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪ হাজার ৮২৭ জন, বিএনপির ৬০৯ জন, জামায়াতের ১৪৫ জন, এনসিপির ৪৩ জন এবং চরমপন্থী সংগঠনের ৩৭ জন রয়েছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অভিযানে ৬৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক্বিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত এবং ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে এইচআরএসএস জানায়, গত নয় মাসে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। এ সময় ২০ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশ অটোরিকশা জব্দ করায় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে এক অটোরিকশাচালকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের শেষে মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস।




