ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৩৩৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। অন্যদিকে, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের ঘটনায় মোট ৩৪ হাজার ৯২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৭৪৪টি মামলা শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত।

শিশুরা নিজেদের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে জড়িত থাকছে আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপরিচিত ব্যক্তিরা। খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে, খেলার ছলে ডেকে নিয়ে, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা ব্ল্যাকমেইল করেও শিশুদের নির্যাতন করা হচ্ছে বলে পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠন-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩৩৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের পুরো বছরে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৩০৮টি। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বয়সভিত্তিক হিসাবে সাত থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এমনকি শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরাও এ ধরনের নির্যাতন থেকে নিরাপদ নয়। তবে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

নির্যাতনের শিকার শিশুদের মধ্যে দুজন আত্মহত্যা করেছে, ১১ জন গর্ভধারণ করেছে এবং ৩২ জন হত্যার শিকার হয়েছে বলে সূত্রের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ১৬ জন প্রতিবন্ধী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শিশু ধর্ষণের ঘটনা সাধারণত বাড়ি, পরিচিতজনের বাসা, নির্জন মাঠ, দোকান, পরিত্যক্ত ভবন, স্কুল ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘটে। কিছু ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা শিশুর প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, দোকানদার, নিরাপত্তাকর্মী কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় অপরাধের ঘটনা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে অপরিচিত ব্যক্তির তুলনায় পূর্বপরিচিতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশি উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অভিযুক্তদের বয়স সাধারণত ২০ থেকে ৬০ বছর বা তার বেশি; তাঁদের মধ্যে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বেশি।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরে সংঘটিত ৩৩৬টি ঘটনার বিপরীতে মামলা হয়েছে ২২৯টি। এর মধ্যে ৭৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং ৩০টি ঘটনায় কোনো অভিযোগই করা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে। এসব মামলায় ২৬২ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও দণ্ডের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, গ্রামাঞ্চলে কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হলে অনেক সময় তার পরিবার ঘটনাটি গোপন রাখে। অর্থের বিনিময়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তিনি বলেন, শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখা জরুরি। কোনো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার শিশু ও তাদের পরিবার যেন ভয় বা সামাজিক চাপের কারণে অভিযোগ জানানো থেকে বিরত না থাকে, সে জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।