খুলনা প্রতিনিধি: সুপেয় পানির সংকট, নদীভাঙন, ভঙ্গুর যোগাযোগব্যবস্থা ও সুন্দরবনে জলদস্যুর আতঙ্ক—এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান খুলনার দাকোপ উপজেলার উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা। আগামী ২২ অক্টোবর দাকোপের নলিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর ঘিরে তাঁদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশা, সফরকালে উপকূলের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হলে সুপেয় পানি, টেকসই সড়ক ও বেড়িবাঁধ, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং সুন্দরবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার হবে।

দাকোপের প্রত্যন্ত এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। কোথাও দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, আবার কোথাও কিনে নিতে হয়। পাশাপাশি কাঁচা ও ভাঙাচোরা সড়কে বর্ষায় কাদা এবং শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালুর কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় বাসিন্দাদের।

দাকোপ উত্তরপাড়ার বাসিন্দা সমির ফকির (৬৫) বলেন, সুপেয় পানির পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থাও খারাপ। শুষ্ক মৌসুমে ধুলা আর বর্ষায় কাদার কারণে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।

কালাবগীর বাসিন্দা মনিরুল গাজী (৪৫) জানান, আধা কিলোমিটার দূর থেকে প্রতি লিটার ৫০ পয়সা দরে পানি কিনে আনতে হয়। পরিবারের সাত সদস্যের জন্য তিন-চার ড্রাম পানি দিয়ে পাঁচ-ছয় দিন চলতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে পানির ব্যবস্থা না করে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের স্থায়ী উদ্যোগ নিতে হবে।

নদীভাঙনে জমি হারানোর শঙ্কা

কালাবগীর ঝুলন্তপাড়া এলাকায় শিবসা নদীর ভাঙনে বিস্তীর্ণ জমি বিলীন হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। নদীভাঙনের পাশাপাশি দুর্বল সড়ক যোগাযোগ তাঁদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

কালাবগীর বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, তাঁর ৪৪ বছরের জীবনে রাস্তাটি সাতবার ভাঙতে দেখেছেন। শিবসার মোহনায় প্রায় ৫০০ বিঘা জমি বিলীন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

কামরুল ইসলামের ভাষ্য, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে উপজেলা সদরের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন। কয়েক দিন আগে তাঁদের এলাকার এক গৃহবধূ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, নদীভাঙন রোধ, টেকসই সড়ক নির্মাণ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হলে উপকূলবাসীর দুর্ভোগ কমবে।

সুপেয় পানির সংকটে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

সুপেয় পানির অভাব ও প্রতিকূল পরিবেশের প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পল্লিচিকিৎসক ডা. ইসমাইল আহমদ বলেন, সুন্দরবন ও নদীকেন্দ্রিক পেশায় যুক্ত মানুষের মধ্যে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা যায়। নিরাপদ পানির অভাব ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ঘাটতি বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নিরাপদ পানির পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র, পর্যাপ্ত চিকিৎসক এবং জরুরি রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

সুন্দরবনে জলদস্যুর আতঙ্ক

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় জলদস্যুদের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বনজীবী ও জেলেদের মধ্যে। জীবিকার তাগিদে নদী ও বনে যেতে হলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তাঁরা।

সুতারখালীর জেলে ফারুক ফকির (৩২) অভিযোগ করেন, সুন্দরবনে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুদের চাঁদা দিতে হয়। নৌকা নিয়ে বনে যেতে বিকাশ খরচসহ ২০ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয় বলে তাঁর অভিযোগ। টাকা দিতে অস্বীকার করলে মারধরের শিকার হতে হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

ফারুকের দাবি, সুন্দরবনে আট থেকে নয়টি ডাকাত দল সক্রিয় রয়েছে। বনজীবীদের অভিযোগ, আড়বানি খাল, কুমড়াকাটি, আদা চাকী, হারবাড়িয়া ও শেকের টেকসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৎপরতা রয়েছে। জলদস্যুদের ভয়ে অনেকে বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এতে মাছ ধরা ও বনজ সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাঁদের দাবি, নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করতে হবে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি

আইলা ও আম্পানসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এখনো সংগ্রাম করছেন দাকোপের মানুষ। তাঁদের দাবি, টেকসই ও ঘূর্ণিঝড়সহনশীল বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, পাইপলাইনে সুপেয় পানি সরবরাহ, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং সুন্দরবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

স্থানীয়দের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মানুষের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়বে।

সফর ঘিরে প্রশাসনের প্রস্তুতি

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর প্রসঙ্গে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, সম্ভাব্য আগমন ঘিরে এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।

তিনি জানান, নলিয়ান ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট, টেকসই বেড়িবাঁধ এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের গুরুত্ব সম্পর্কে সরকার অবগত। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় জলদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ নজরদারিও জোরদার রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর ঘিরে দাকোপবাসীর প্রত্যাশা—দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে এবার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।