খুলনা প্রতিনিধি: দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ জনবহুল ও ব্যস্ততম যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে অন্যতম খুলনার রূপসা ঘাট। প্রতিদিন এই ঘাট দিয়ে রূপসা উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন। খুলনা শহর ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন এই নদীপথ। অথচ ঐতিহ্যবাহী এই ঘাটটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও রূপসা ঘাটের নিয়মের চিত্র বদলায়নি; বরং এখানকার অনিয়ম ও নৈরাজ্য এখন ওপেন সিক্রেট এবং এক প্রকার নিয়মে পরিণত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য এবং মাঝিদের স্বেচ্ছাচারিতায় প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রূপসা ঘাটের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) হাতে। ২০২৪ সালের চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর পর এই ঘাটের পরিচালনায় পরিবর্তন আসে। কেসিসি পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটটির নিয়ন্ত্রণ নেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উল্টো পূর্বের টোলের তুলনায় দ্বিগুণ হারে টোল আদায় শুরু হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। নিত্যদিনের যাতায়াতকারীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ পরিবর্তনের সুফল তো দূরে থাক, উল্টো তাদের ঘাটে প্রবেশ করতেই দ্বিগুণ অর্থ গুণতে হচ্ছে। ঘাট পারাপারের সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের কারণ অস্বাভাবিক হারে টোল বৃদ্ধি। অতীতে ঘাটে প্রবেশের জন্য যে ফি নেওয়া হতো, বর্তমানে তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। শুধু যাত্রীদের কাছ থেকেই নয়, যাত্রীদের ব্যবহৃত কাপড়েরর ব্যাগ, বাজারের থলে বা সাধারণ বহনের জিনিসপত্রের ওপরও অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে। অথচ দ্বিগুণ টাকা আদায় করা হলেও রূপসা ঘাটের সেবার মান ন্যূনতম পরিমাণেও বাড়েনি। ঘাটের গ্যাংওয়ে বা পন্টুনের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত নাজুক। ভাঙা গ্যাংওয়ে দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের পারাপার হতে হয়। সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু ঘাটের টার্মিনালেই নয়, নদী পারাপারের ট্রলার বা নৌকার মাঝিদের বিরুদ্ধেও রয়েছে অতিরিক্ত পারানি আদায়ের গুরুতর অভিযোগ। নিয়মানুযায়ী জন প্রতি ট্রলার ভাড়া ৪ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ৫ টাকা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি ট্রলারেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এই নৈরাজ্য আরও তীব্র আকার ধারণ করে। রাত সাড়ে ১০টার পর ট্রলারে দ্বিগুণ যাত্রী বোঝাই করা হয়। আর রাত সাড়ে ১১টার পর ৫ টাকার নির্ধারিত ভাড়া বাড়িয়ে সরাসরি ১০ টাকা আদায় করা হয়। অসহায় যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে মাঝিদের হাতে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হন। রূপসা ঘাটের এই অনিয়মের নির্মম শিকার হচ্ছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও। রূপসা উপজেলার নৈহাটি গ্রামের বাসিন্দা রাজমিস্ত্রি মো. মনিরুল হাসান সুমন। জীবিকার তাগিদে তাকে প্রতিদিন সকালে সাইকেল চালিয়ে খুলনায় আসতে হয়। আগে সাইকেল বাবদ ঘাটে দুই টাকা টোল দিতে হলেও বর্তমানে তাকে দিতে হচ্ছে পাঁচ টাকা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নৌকা ভাড়াও। সব মিলিয়ে প্রতিদিন তাকে কেবল ঘাট পারাপার বাবদই ত্রিশ টাকা গুণতে হয়। সাইকেলে কোনো অতিরিক্ত পণ্য থাকলে তার জন্যও দিতে হয় বাড়তি টাকা। দিদারুল ইসলাম দিদার আক্ষেপ করে জানান, গত কিছুদিন আগে রাতেরবেলা গ্যাংওয়ের ভাঙা অংশে পা পিছলে পড়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ক্ষত হয়। কিন্তু দেখার কেউ নেই।
রূপসা ঘাটে নৈরাজ্য
দ্বিগুণ টোল, ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার ও চরম জনদুর্ভোগ




