ডেস্ক রিপোর্ট: ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে লগি-বৈঠার হামলায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয় এবং বাংলাদেশে দলটির রাজনীতি করার অধিকার নেই। একই সঙ্গে দেশে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সংবিধান সংস্কার ও গণপরিষদ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আইডিইবি ভবনের মাল্টিপারপাস হলে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করা। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন নেই। তিনি দলটিকে ফ্যাসিবাদী আখ্যা দিয়ে বলেন, সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব ঘটনার যথাযথ বিচার হয়নি।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা স্মরণ করে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, সেদিন লগি-বৈঠা নিয়ে হামলা চালিয়ে মানুষকে হত্যা করা হয় এবং নিহতদের মরদেহের ওপর নৃত্য করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও কীভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার নথিপত্র ও আলামত নষ্ট এবং মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। তিনি বলেন, তাঁরা খুনিদের বিচার চান, কিন্তু কারও ওপর অন্যায়ভাবে বিচার চাপিয়ে দেওয়া বা নিরপরাধ কাউকে শাস্তি দেওয়া তাঁদের লক্ষ্য নয়। তাঁর ভাষায়, “আমরা এ বিচারের শেষ দেখে ছাড়ব।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে অতীতের অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কোনো দল বা গোষ্ঠী যেন রাষ্ট্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের মধ্যে যাঁরা ভালো মানুষ রয়েছেন, তাঁদের নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক ঠিকানা বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশা থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে রাজনীতি করতে হলে মানবিক ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি করতে হবে। সন্ত্রাস ও পাশবিকতার রাজনীতির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।

জুলাই আন্দোলন ও গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে পরিবর্তন চায়। তাঁর মতে, জনগণের প্রত্যাশা শুধু সংবিধানে সামান্য পরিবর্তন আনা নয়, বরং এমন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ভবিষ্যতে কেউ ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে না পারে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের জন্য গণপরিষদ গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে হলে তাঁদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ন্যায়বিচার ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর এবং ২০২৪ সালের জুলাইসহ বিভিন্ন সময়ে নিহতদের স্মরণ করে তিনি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ ও উত্তর জামায়াতের নেতারা এবং ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন।

এটিএম আজহারুল ইসলাম ২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে এর বিচার দাবি করেন। মিয়া গোলাম পরওয়ারও ওই ঘটনাকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং অভিযোগ করেন, এর মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তিনি বিএনপির প্রতিও জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, সভায় আওয়ামী লীগ ও অতীতের বিভিন্ন সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে বক্তারা যেসব অভিযোগ তুলেছেন, সেগুলো তাঁদের বক্তব্যের অংশ; এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার।