আবু সাইদ বিশ্বাস: জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে পরিবহন সংকটে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে দেখা দিয়েছে স্থবির। ডিজেলের স্বল্পতার কারণে ট্রাক চলাচল কমে যাওয়ায় বন্দরে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো পণ্য গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় পথে নষ্ট হচ্ছে কাঁচামাল, বাড়ছে ট্রাকভাড়া ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে প্রতিদিন যেখানে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ট্রাক পণ্য নিয়ে বন্দরে প্রবেশ করত, বর্তমানে তা কমে প্রায় ২০০টিতে নেমে এসেছে। দূরপাল্লার ট্রাকগুলো সময়মতো ফিরতে না পারায় পরিবহন ব্যবস্থায় ধীরগতি তৈরি হয়েছে। ফলে বন্দরে খালাস হওয়া পণ্য সময়মতো সরানো যাচ্ছে না এবং পণ্যের স্তূপ জমে থাকছে। ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানিকারক রিপন হোসেন বলেন, দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রান্সপোর্টগুলো ঠিকমতো গাড়ি দিতে পারছে না। অল্প কিছু গাড়ি দেওয়া হলেও অনেক সময় সেগুলো মাঝপথে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গের দিকে যতগুলো গাড়ি পাঠাচ্ছি, তার অর্ধেক পথেই গিয়ে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা থেকে স্বল্প পরিমাণ তেল নিয়ে গাড়ি ছাড়লেও তা গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। ফলে মাল দেরিতে পৌঁছাচ্ছে এবং কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মাল দেরিতে পৌঁছানোর কারণে অনেক পার্টি কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। এতে আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি। জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে আমাদের ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সাতক্ষীরা ভোমরা ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদিন কিরণ বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাকভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, আগে এক ট্রাক মাল ঢাকায় পৌঁছাতে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা খরচ হতো। বর্তমানে সেই খরচ বেড়ে ৩০ থেকে ৩৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে আমরা ট্রাক পাঠাতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বগুড়া, রংপুর, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে তেল সংকট তীব্র হওয়ায় এসব রুটে ট্রাক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তেল সংকটের কারণে তিন থেকে চার দিন পরপর একটি করে ট্রাক ভোমরায় ঢুকছে। অনেক সময় ফল, আদা ও অন্যান্য কাঁচামাল রাস্তায় তেল ফুরিয়ে পড়ে থাকছে, বলেন তিনি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে বন্দরে খালাস হওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্য ট্রাকের অভাবে সময়মতো সরানো যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সময়ে বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ট্রাকচালক বাবু বলেন, ভোমরা থেকে মাল নিয়ে বাইরে গেলে অনেক জায়গায় তেল পাওয়া যায় না। এতে আমাদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং আয়ও কমে যাচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হোক। আরেক ট্রাকচালক সুমন হোসেন বলেন, আগে যেখানে দুই দিনে একটি ট্রিপ দেওয়া যেত, এখন সেখানে এক সপ্তাহেও একটি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, গতকাল রাতে পাম্পে সিরিয়াল দিয়েছি, দুপুর হয়ে গেছে তবুও তেল পাইনি। কখন পাব, তারও নিশ্চয়তা নেই। ট্রাকচালক আশিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় ঠিকমতো খাওয়া-ঘুমও হচ্ছে না। তিনি বলেন, আগে চট্টগ্রাম ঘুরে আসতে প্রায় ১৮০ লিটার তেল লাগত। এখন অল্প অল্প করে তেল নিতে নিতে মোট প্রায় ২১০ লিটার পর্যন্ত লাগছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পচনশীল পণ্য। সময়মতো পরিবহন না হওয়ায় কাঁচামরিচ, আদা, ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোমরা স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা বলেন, ভোমরা স্থলবন্দর এখন পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউজে রূপান্তর হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা নানা সুবিধা পাচ্ছেন এবং বাণিজ্য কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ঠিক এ সময় জ্বালানি সংকট আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পরিবহন সংকটের কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখতে সরকারকে বিষয়টির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বন্দরের কার্যক্রমে আরও স্থবিরতা নেমে আসতে পারে।
