সাতক্ষীরায় রাতের আঁধারে গোপনে বিক্রি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

মুহা: জিললুর রহমান: সাতক্ষীরা জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত দুইদিন ধরে জেলার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকে তেল না পাওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, কিছু অসাধু পাম্প মালিক ও কর্মচারীরা রাতের আঁধারে গোপনে অতিরিক্ত দামে তেল বাইরে বিক্রি করছেন। কিন্তু পাম্প মালিদের অভিযোগ সাতক্ষীরাতে চাহিদা অনুযায়ি অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল ডিপো থেকে সরবরহ না থাকায় এ সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে পাম্পে তেল নিতে আসা গাড়ীর মালিকদের অভিযোগ ড্রামে ভরে ভ্যানে করে এসব তেল পাচার করা হচ্ছে। এছাড়াও কিছু কিছু বাইকে ট্রাংকি ফুল করে স্বজনপ্রীতি করার দৃশ্য দেখা গেছে। ফলে জ্বালানি তেলের সংকট ও অবৈধ বিক্রির কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, জেলার কোন পাম্পে তেল পাওয়া না গেলেও বাইরের দোকানে অনেক সময় তেল পাওয়া যাচ্ছে। এসব তেল গোপানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে প্রতি লিটার পেট্রোল ২০০ এবং অকটেন ২২০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সাধারণ ক্রেতারা পাম্পে তেল না পেয়ে অনেকে চড়া দাম দিয়ে বাইরের দোকান থেকে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অল্প সংখ্যাক গ্রাহকদেরেকে সামান্য তেল দিয়ে বাকিটা মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে, যাতে পরে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা যায়। পরে গভীর রাতে ওই তেল ড্রামে ভরে ভ্যান করে পাচার করা হচ্ছে। যা সরকার নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা বেশি দামে কিনছেন খুচরা দোকানীরা। পরে ওই তেল এক লিটারের বোতলে ভরে প্রায় দ্বিগুন দামে বিক্রি করা হচ্ছে গ্রাহকদের কাছে। যা সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের এবি খান প্রেট্রোল পাম্প ও সংগ্রাম ফিলিং স্টেশনসহ বেশ কয়েকটি পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে তেল বিক্রির মেশিনের গায়ে সাদা কাগজে লেখা তেল নেই। দূরদূরান্ত থেকে মটর সাইকেলে তেল নেওয়ার জন্য গ্রাহকরা এসে ফিরে যাচ্ছে। এসব ফিলিং স্টেশনে কর্মরত কর্মচারীরা কখন থেকে তেল দিবে তাও বলতে পারছেন না। একই অবস্থা শহরের প্রায় সব পাম্পেই।
আশাশুনি উপজেলার বুড়িয়া গ্রামের আব্দুল্লাহ জানান, সকালে শহরের এসেছিলাম মটর সাইকেলে তেল নেওয়ার জন্য। এসে দেখি পাম্পে কোন তেল নেই। শহর থেবে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ি। মটর সাইকেলে যে তেল আছে তাতে আমি বাড়ি পর্যন্ত পৌছাতে পারবো না। এখন মটর সাইকেল শহরে রেখে যাওয়া ছাড়া কোন গতি নেই।
এবি খান প্রেট্রোল পাম্প তেল নিতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক জানান, দুই/তিনদিন ধরে পাম্পে আসছি তেল নিতে। কিন্ত কোন তেলা পাই না। বাধ্য হয়ে গতকাল (রোববার) শহরের কুখরালী এলাকার একটি মুদি দোকান থেকে ২০০ টাকা দিয়ে এক লিটার তেল কিনেছিলাম, যা প্রায় শেষের পথে। আজ তেল না পেলে মটর সাইকলে ঘরে উঠিয়ে রাখতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, শহরের কোন পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু শহরে ও এর আাশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় মুদি দোকানে গোপনে চড়া দামে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে। পাম্প বন্ধ থাকায় গাড়িতে তেল ভরতে অনেকেই চড়া দামে বাইরে থেকে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি কালো বাজারে জ্বালানী তেল বিক্রি বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানান।
আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের মো. হুসাইন আলী জানান, ঈদের আগে তিনি একটি জিক্সার মটর সাইকেল কিনেছেন। কিন্তু তেলের অভাবে নতুন মটরসাইকেল চালাতে পারছে না। বাড়ি থেকে সাতক্ষীরায় আসার পথে স্থানীয় বুধহাটা বাজারে এসে গাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়। ফলে সেখানেই মটর সাইকেল রেখে তিনি তেল নেওয়ার জন্য পট নিয়ে শহরে চলে আসেন।
তিনি বলেন, সাতক্ষীরা শহরের ৫টি পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে তিনি বাসে চড়ে যশোরে চলে যান। সেখানে আরো ৭টি পাম্প ঘুরে পরে একটি বন্ধ পাম্পের পিছন থেকে ৫লিটার তেল কিনে আনেন। তারা আমার সমস্যার কথা শুনে পটে আমাকে ৫লিটার পেট্রোল দেয়। তেল নিয়ে সোমবার ভোর রাত ২টার দিকে তিনি সাতক্ষীরায় আসেন। ওই ৫লিটার পেট্রোল কিনতে তার প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তিনি।
শহরের সংগ্রাম পাম্পের ম্যানেজার জানান, গোপনে রাতে তেল বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার পাম্পের কোন লোক এধরনের অবৈধ কাজের সাথে জড়িত নয়। আমার পাম্পে যতক্ষন তেল থাকে আমি বিক্রি করি। ঈদের পরে এখনো নতুন কোন চালান না আসায় কিছুটা সংকট তৈরী হয়েছে। তেল আসলে আবার গ্রাহকরা আমার পাম্প থেকে তেল পাবেন বলে জানান তিনি।
শ্যামনগর ফিলিং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিকুল ইসলাম বকুল বলেন , আমরা পাম্প মালিকরা ডিপো থেকে চাহিদা আনুযায়ী ডিডি করছি কিন্তু ডিপো খেকে পেট্রোল অকটেন ও ডিজেল না দেয়ায় যে গাড়ীতে করে আমরা থ্যামনগরে তেল এনে বিক্রি করছি তাতে গাড়ীর ভাড়ার টাকা উঠছে না। আমাদের চাহিদা পেট্রোল ৬ হাজার লিটার অকটেন ৩ হাজার লিটার ও ডিজেল ৫ হাজার লিটার সেখানে আমরা ডিপো থেকে পাচ্ছি পেট্রোল ১/২ হাজার লিটার অকটেন নাই ডিজেল ৩ হাজার লিটার।
এদিকে খবর পেয়ে সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক সোমবার (২৩ মার্চ) বেলা সাড়ে ১০টার দিকে শহরের লস্কর ফিলিং স্টেশন পরিদর্শনে যান। এসময় সেখানে উপস্থিত গ্রাহকরা অভিযোগ করে বলেন, পাম্প থেকে তেল দিচ্ছে না, অথচ বাইরের দোকানে ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় এক লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে । পাম্পে তেল না থাকলে তারা তেল পাচ্ছে কিভাবে? প্রশ্ন রাখেন গ্রাহকরা। সংসদ সদস্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে সাতক্ষীরায় তেল সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতার জানান, জ্বালানী তেল নিয়ে যে কোন ধরনের অনিয়ম দূর করতে আমার ভিজিলেন্স টিম সব সময় মাঠে কাজ করছে। সুনিদিষ্ট কোন অভিযোগ পেলে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ঠদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলায় জ্বালানী তেলের সংকট সমাধানে কালো বাজারে বিক্রি বন্ধে আজ থেকে অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি।
সাতক্ষীরায় পরিকল্পিতভাবে জ্বালানী তেলের সংকট সৃষ্টি করে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রির ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তারা দ্রুত এই অনিয়ম বন্ধ করে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *