স্টাফ রিপোর্টার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব নিয়োগ কার্যকর থাকবে। আগের প্রশাসকদের সরিয়ে এসব পদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে এবার আমলাদের পরিবর্তে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। নতুন দায়িত্ব পাওয়া ছয়জনই বিএনপির প্রভাবশালী ও জ্যেষ্ঠ নেতা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি আবদুস সালাম। তিনি একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদেও রয়েছেন।
আবদুস সালাম ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি। তবে এই নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান মিয়াকে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের অক্টোবরের শেষে তাকে সরিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মো. মাহমুদুল হাসানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখন মাহমুদুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হলেন আবদুস সালাম।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নতুন প্রশাসক করা হয়েছে শফিকুল ইসলাম খানকে। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এবং এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শফিকুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। ডিএনসিসির সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই মাসের শুরুতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখন তার জায়গায় এলেন শফিকুল ইসলাম খান।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন: গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান শওকত হোসেনের বাবা গিয়াসউদ্দিন সরকার, চাচা সোহরাব উদ্দিন সরকার এবং দাদা জবেদ আলী সরকারও কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছিলেন। শওকত হোসেন নিজেও টানা ১০ বছর কাশিমপুর ইউপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের অপসারণের পর অন্তর্বর্তী সরকার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। এখন তার স্থলাভিষিক্ত হলেন শওকত হোসেন সরকার।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নতুন প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি আলোচিত সাত খুনের মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে নাসিক প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। এখন সেই স্থলাভিষিক্ত হলেন সাখাওয়াত হোসেন খান।
সিলেট সিটি করপোরেশন: সিলেট সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক হয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বিসিবির পরিচালক ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও তিনি সিলেটের সবকটি আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত প্রশাসক খান মো. রেজা-উন-নবীর স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি।
খুলনা সিটি করপোরেশন: খুলনা সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এর আগে, দীর্ঘ ২৮ বছর খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। এর মধ্যে ১৬ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ১২ বছর ছিলেন সভাপতি। সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে ধানের শীষে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করলেও জিততে পারেননি। জামায়াতে ইসলামীর খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে হারেন তিনি। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোটের ভরাডুবির মধ্যেও খুলনা-২ আসনে জয় পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোখতার আহমেদের স্থলাভিষিক্ত হলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
