ইতিহাসের কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে কালিগঞ্জের ‘নবরত্ন’ মন্দির

স্টাফ রিপোর্টার: জলাধারের স্থির জলে প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে এক খণ্ড ভাঙাচোরা ইতিহাস। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কুশলিয়া ইউনিয়নে একসময়ের জৌলুসপূর্ণ ৫০০ বছরের পুরনো ড্যামরাইল নবরত্ন মন্দিরটি এখন কেবল ইটের এক কঙ্কালসার স্তূপ। আগাছা আর পরগাছার শেকড়ে বন্দী এই স্থাপত্যটি যেন নি:শব্দে ধসে পড়ার প্রহর গুনছে। জলাধারের পাড়ে বিষণ্ণ দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষী। সম্প্রতি মন্দির এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। একসময় যেখানে চূড়াগুলো আকাশ ছুঁতে চাইত, সেখানের বট-পাকুড়ের ডালপালা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে মন্দিরটিকে। পাতলা ইটের গাঁথুনি খসে পড়ছে। মন্দিরের চারপাশের জলাধারটি ইতিহাসের সাক্ষ্য দিলেও এর অবকাঠামো এখন জরাজীর্ণ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো এক পরিত্যক্ত টিলা সিক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৫৮০-এর দশকে রাজা প্রতাপাদিত্যের পিতা রাজা বিক্রমাদিত্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বাংলার নিজস্ব নবরত্ন শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের ছাদে ছিল ৯টি সুদৃশ্য চূড়া। তৎকালীন দক্ষিণবঙ্গের ধর্মীয় স্থাপত্যের এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ছিল এটি। কিন্তু আজ চূড়া নেই, নেই সেই কারুকাজ করা দেয়াল; আছে শুধু ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়ার হাহাকার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমীরা যখন এই দুর্লভ স্থাপত্য দেখতে আসেন, তাদের চোখেমুখে ধরা পড়ে বিষাদ। পর্যটকদের জন্য কোনো পথ নেই, নেই সামান্য বিশ্রামের জায়গা। স্থানীয়রা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ‘‘প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। বছরের পর বছর যায়, সংস্কারের কোনো ছোঁয়া লাগে না। জরুরি ভিত্তিতে এই মন্দিরের সংস্কার করা না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। এটি কেবল একটি মন্দির নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ।’’ স্থানীয় কালিগঞ্জ রোকেয়া-মনসুর মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক নিয়াজ কওছার তুহিন বলেন, দেয়ালের ফাঁক দিয়ে গজিয়ে ওঠা গাছগুলো মন্দিরের ভিত্তি আলগা করে দিচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে শেষ স্মৃতিটুকুও। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই দখলদার পরগাছা পরিষ্কার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মন্দিরটি সংস্কার করা হোক। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বাংলার এই অমূল্য রত্নটি কি শেষ পর্যন্ত ধুলোয় মিশে যাবে? নাকি নতুন করে প্রাণ পাবে ড্যামরাইলের এই নবরত্ন? উত্তর এখন সময়ের হাতে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *